আমি যেখানে পড়াই ছাত্রদের সাথে বইয়ের থেকে বইয়ের বাইরের কথা মনে হয় বেশি হয়। কোন একটা শব্দের অর্থ বোঝাতে গিয়ে চলে যাই অন্য কোন গল্পে! অনেকক্ষণ কথা বলতে বলতে ক্লাসের সময়ই শেষ হয়ে যায়। ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে মনে পড়ে, আমি যখন ক্লাস এইটে পড়তাম, তখন আমাদের ইংরেজি পড়াতেন ‘অরুণ’স্যার(শ্রদ্ধেয়)। তিনি প্রায়ই পড়াতে পড়াতে হঠাৎ হঠাৎ রবিঠাকুরের কবিতার লাইন বলতেন।

অন্যদের কথা জানিনা… তবে আমি ছোটবেলা থেকেই কবিতা শুনতে বা পড়তে পারলে আর কিছু লাগত না। তো, অরুণ স্যার একদিন শুনিয়েছিলেন…
“উদয়ের পথে শুনি কার বাণী
ভয় নাই ওরে ভয় নাই
নি:শেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই”….
আবার বলেও দিয়েছিলেন ছত্রগুলো রবিঠাকুরের…

রবীন্দ্রনাথ এঁর সাথে পরিচয় এর আগেই অল্পবিস্তর হয়েছিল কিন্তু ওই দিন স্যার বোধহয় রবীন্দ্রনাথকে আমার মনে আজীবনের জন্য খোদাই করে দিয়েছিলেন। আমি এরপর থেকেই মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে এই লাইনগুলো ভাবতাম…শুনতাম।

এরপর তো কেটে গেছে অনেকটা কাল… জীবন আর ছোটবেলার মতো সরল সহজ রয়নি। জীবনে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতাও হয়েছে, অনেকে জ্ঞান দিতে এসেছে…মানুষের জন্য কিছু করলে, উল্টে সে তোমার ক্ষতি করবে,উপকারীকে বাঘে খায়, অন্যের ভাল করতে গেলে বাঁশ খেতে হবে, অতি ভালোর ভাত নাই…ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু যতই শঠতা থাকুক, যতই প্রতারনা, তিক্ততা থাকুক… মানুষের ভালো চাইতে, মানবিক হতে দোষ কি! এটাই ত মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হওয়া উচিত! নদীর যেমন স্রোত, মানুষেরও তেমন দয়া, মায়া, ভালোবাসা হওয়া উচিত।

মানুষের মনে মানুষের জন্য, পৃথিবীর সকল মানুষ বা পশুপাখির জন্য উগ্রতার জায়গায় ভালোবাসা, সহিষ্ণুতা জন্ম নিক।তাহলেই শুধুমাত্র পৃথিবীর লোক সুখে বাঁচতে পারবে।

একটাই তো জীবন, তাও কতো ছোট! এই ছোট জীবনটা ঘৃনা আর বিভেদ নিয়ে যারা কাটায়…তারা কত বঞ্চিত! আমি বিশ্বাস করি তাদের মনে কোন শান্তি নেই। কারণ যে শান্তি ভালোবেসে, যে আনন্দ অন্যের জন্য কিছু করতে পারায়, তা আর কিসে আছে! তাই একটা ছোট জীবন সকল প্রাণ, সকল জীবন আর সমস্ত প্রকৃতিকে ভালোবেসে কাটালে ক্ষতি কিছু নেই, প্রাপ্তি অসীম…
লাভ ক্ষতির কথা, পরিনতির কথা ভেবে ভেবে যে ভালোবাসা, সে কিরকম ভালোবাসা! আদৌ ভালোবাসা?

আমি এখনো চোখ বন্ধ করলে স্যারের সেই দরাজ কণ্ঠ শুনতে পাই..
‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী
ভয় নাই ওরে ভয় নাই….
নি:শেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই’

লেখক: অণূঢ়া বৈভব মালঞ্চ