নিউজিল্যান্ডের সন্ত্রাসী ঘটনার পরের শুক্রবারে কথা হচ্ছিল এক বন্ধুর সঙ্গে। খুব উত্তেজিত কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘দেখেছো, নিউজিল্যান্ড আজ যেনো এক মুসলিম দেশে পরিনত হয়েছে’। বুঝতে পারি, ঐ শুক্রবারে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, কর্মকান্ড এবং পুরো দেশ যা করেছে, সে সবের ভিত্তিতেই তিনি এ রকমের একটি মতামত ব্যক্ত করেছেন। সেই সঙ্গে দেখলাম যে কোন একটি পত্রিকাও লিখেছে,’ নিউজিল্যান্ড ইসলামিক আদর্শকে বিরাট বড় মূল্য দেয়’। বিভ্রান্তির এবং ভুল স্হানে গুরুত্ব প্রদানের এ যেন এক বিরাট বড় নিদর্শন।

নিউজিল্যান্ড যা করেছে, তাতে দেশটি একদিনের জন্যে হলেও ইসলামী রাষ্ট্রে পরিনত হয়েছে কিংবা নিউজিল্যান্ডের ইসলামের প্রতি বিশেষ ভালবাসা আছে, এমন ভাবাটা বাতুলতা। নিজ ধর্মবিশ্বাসের প্রতি আমাদের দূর্বলতা থাকতে পারে, কিন্তু তাই বলে কোন ধর্মীয় আচ্ছন্নতায় অন্ধ হয়ে কোন একটি বিষয়কে ভুল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা এবং সেই সঙ্গে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে তার ভুল ব্যাখা দেয়া বিভান্তিমূলক ও অন্যায়।

মনে রাখা দরকার, নিউজিল্যান্ড মানবাধিকার, মানবিকতা ও মানবতাপ্রোথিত একটি রাষ্ট্র। দেশটি ধর্মনিরপেক্ষও বটে। সেই দৃষ্টিকোন থেকে ধর্ম, বর্ণ, ভাষা নির্বিশিষে নিউজিল্যান্ডের সব নাগরিকের সমানাধিকার এবং সেই প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রযন্ত্র যে কোন মূল্যে সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তা বিধান করতে বদ্ধপরিকর। সুতরাং সেখানে সন্ত্রাসটি যদি বৌদ্ধমন্দিরে হোত, তা’হলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী দেশটবৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সহমর্মিতা প্রকাশ করতেন, বেতারে ত্রিপিটক পাঠ হত এবং বৌদ্ধদের উপাসনালয়গুলোর নিরাপত্তা বিধান করা হত। সুতরাং শুধু মুসমানদের জন্যেই নিউজিল্যান্ড এমনটি করেছে এ রকম আত্মশ্লাঘা অনুভব করার কোনই সঙ্গত কারন নেই – বরং ও রকমটি ভাবলে দেশটির আসল চরিত্র ও স্বরূপ আমরা বুঝতে পারব না।

আসলে নিউজিল্যান্ডের দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তা-চেতনা ও কর্মকান্ড থেকে যেটা আমাদের উচ্চকণ্ঠে বলা উচিত ও শেখা দরকার, তা’হচ্ছে একটি রাষ্ট্রে ও সমাজে সব মানুষের অধিকার সমান, এবং সব জনগোষ্ঠীর অধিকার ও নিরাপত্তা বিধান করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। সুতরাং যে কোন জনগোষ্টী, তা যত ক্ষুদ্র সংখ্যালঘুই হোক না কেন, তার অধিকার, নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের ওপরে যদি আঘাত আসে, তা’হলে রাষ্ট্র ও বৃহত্তর সমাজ তা প্রতিহত করবেই।

দু:খের বিষয়, আমরা তো উপরোক্ত ব্যাপারটি না আমাদের চিন্তা-চেতনার মধ্যেই আনতে পারিনি – গত সত্তুর দশকেও নয়। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান তো দূরের কথা, সংখ্যালঘু উৎপীড়ন, উৎপাটন ও নিধন সংখ্যাগুরু সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবং সেটা শুধু গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রেই নয়, সমাজের অন্যান্য সংখ্যলঘুদের – যেমন, নারীদের, প্রতিবন্ধীদের, ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিকগোষ্ঠীদের ক্ষেত্রেও সত্যা।

তাই তো ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগ সময়ে আজকের বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যায় হিন্দু জনগোষ্ঠীর অনুপাত ছিল ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রতি ৩ জন নাগরিকের ১ জন তখন ছিলেন হিন্দু। অর্ধশতাব্দী পরে বাংলাদেশের স্বাধীন বাংলাদেশে সে অনুপাত নেমে আসে ১৯ শতাংশে – অর্থাৎ প্রতি ৫ জন নাগরিকের ১ জন হিন্দু। চার দশক পরে ২০১১ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যায় হিন্দু জনগোষ্ঠীর অনুপাত নেমে আসে ১১ শতাংশে। প্রাক্কলন করা হয়েছে যে, ২০১৬ সালে সে অনুপাত আরো কমে ৮ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। এ প্রবণতা যদি চলতে থাকে, তা’হলে দু’বছর বাদে ২০২১ সনের আদমশুমারীতে হিন্দু জনগোষ্ঠীর অনুপাত কত তে এসে দাঁড়াবে?

বলা নিষ্প্রয়োজন, ১৯৫০, ১৯৬৫র বড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সময় অসময়ে সাম্প্রদায়িক সংঘাত, রাষ্ট্রযন্ত্রের সংখ্যালঘু বিরোধী নীতিমালা প্রনয়ণ ও বাস্তবায়ন, সংখ্যাগুরু ধর্মীয় চরমপন্হী উপগোষ্ঠী কতৃক সংখ্যালঘুদের ভীতি প্রদর্শণ, উৎপীড়ন, তাঁদের বাড়ী-ঘর ও উপাসনালয়ের বিনষ্টীকরণ, তাঁদের নারীদের ওপরে নির্যাতন এবং তাঁদের ধর্মান্তিকরণ সবই সংখ্যালঘু হিন্দুদের উৎপাটন, নিধন ও নিশ্চিহ্নিকরণে সাহায্য করেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সামগ্রিক জনগোষ্ঠীতে তঁাদের অনুপাত কমে এসেছে। আমরা না পেরেছি আমাদের হিন্দু জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষনে, না তাঁদের নিরাপত্তা বিধানে।

সুতরাং নিউজিল্যান্ডের সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহ, নেতৃত্বের বক্তব্য ও কর্মকান্ড ও সামগ্রিক সমাজের প্রতিক্রিয়া ও কার্যক্রম থেকে আমাদের যদি কোন শিক্ষা নিতে হয়, তা হবে সংখ্যালঘুদের সমানাধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, তাঁদের ওপরে চরমপন্হীদের আক্রমনের সময়ে তা প্রতিহত করা ও তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এবং ধর্মকে ব্যক্তিগন্ডিতে আবদ্ধ রেখে সমাজে সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্য ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্হান বিধানকরা। মানবিকতাই প্রথম ও মানবিকতাই শেষ কথা।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক

BeHumaneFirst

(Published as part of social media campaign #StandUnitedAgainstHatred to promote secularism in Bangladesh)